General Dental

টুথপেস্টে ফ্লোরাইড: আপনার শিশুর দাঁতের জন্য এটি কি নিরাপদ?

Prof. Dr. Musa Siddik·৩০ মার্চ, ২০২৬·5 min read

টুথপেস্টে ফ্লোরাইড: আপনার শিশুর দাঁতের জন্য এটি কি নিরাপদ?

আমাদের ব্যবহৃত টুথপেস্টের অন্যতম একটি প্রধান উপাদান হলো ফ্লোরাইড। ১৯৪০ সাল থেকে দাঁতের ক্ষয় রোধ করার জন্য ফ্লোরাইড টুথপেস্টে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আমরা অনেকেই মনে করি ফ্লোরাইড দাঁতের জন্য ভালো, তাই এটি বেশি ব্যবহার করলে হয়তো বেশি উপকার পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার দাঁতের জন্য সুফল বয়ে আনে না, বরং ক্ষতির কারণ হতে পারে।

টুথপেস্টে ফ্লোরাইডের মাত্রা

বাজারে যে টুথপেস্টগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোতে ফ্লোরাইডের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন হয়। সাধারণত কম মাত্রার ফ্লোরাইড (৫০০ পিপিএম), আদর্শ মাত্রার ফ্লোরাইড (১১০০-১৫০০ পিপিএম) এবং বেশি মাত্রার ফ্লোরাইড (>১৫০০ পিপিএম) যুক্ত টুথপেস্ট পাওয়া যায়।

আপনার জন্য কোন মাত্রার ফ্লোরাইড যুক্ত টুথপেস্ট উপযোগী, তা নির্ভর করবে আপনার দাঁতের গঠন এবং অন্যান্য উৎস (যেমন: খাবার, পানি, কিছু ভিটামিন বা ফ্লোরাইড ট্যাবলেট) থেকে আপনার ফ্লোরাইড প্রাপ্তির পরিমাণের ওপর।

শিশুদের ডেন্টাল ফ্লুরোসিসের ঝুঁকি

শিশু এবং ছোট বাচ্চারা প্রায়শই দাঁত ব্রাশ করার সময় না বুঝে টুথপেস্ট গিলে ফেলে। এর ফলে তাদের শরীরে অতিরিক্ত ফ্লোরাইড প্রবেশ করতে পারে, যা থেকে 'ডেন্টাল ফ্লুরোসিস' হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ডেন্টাল ফ্লুরোসিস হলে শিশুর দাঁতে সাদা বা বাদামী দাগ লক্ষ্য করা যায়।

যেসব বাচ্চার বয়স ৬ বছরের নিচে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফ্লোরাইডের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে। কারণ ফ্লুরোসিস শুধুমাত্র বর্ধনশীল দাঁতেই ঘটে; যে দাঁতগুলো ইতোমধ্যে মুখে উঠে গেছে, সেগুলোতে এটি প্রভাব ফেলে না।

শিশুদের জন্য সঠিক ফ্লোরাইডের পরিমাণ

শিশুদের দাঁত ফ্লোরাইডের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হওয়ার কারণে, বাচ্চাদের টুথপেস্ট অবশ্যই কম মাত্রার ফ্লোরাইড যুক্ত (৫০০ পিপিএম) হওয়া উচিত। আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স-এর বর্তমান সুপারিশ হলো, শিশুর দাঁত উঠতে শুরু করার সাথে সাথেই খুব অল্প পরিমাণে ফ্লোরাইড টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করানো শুরু করা উচিত।

সুস্থ দাঁতের জন্য নিচের নিয়মগুলো মেনে চলুন:

  • ২ বছরের কম বয়সী শিশু: টুথপেস্টের একটি "স্মিয়ার" বা চালের দানার পরিমাণ (প্রায় ০.১ গ্রাম টুথপেস্ট বা ০.১ মিলিগ্রাম ফ্লোরাইড) ব্যবহার করুন।
  • ২ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশু: একটি মটর দানার পরিমাণ (প্রায় ০.২৫ গ্রাম টুথপেস্ট বা ০.২৫ মিলিগ্রাম ফ্লোরাইড) ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের পানিতে ফ্লোরাইডের অবস্থান

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, আমরা যে পানি পান করি তা থেকে অতিরিক্ত ফ্লোরাইড শরীরে যাচ্ছে কিনা। গবেষক এ. কে. এম. ফজলুল হকের একটি গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত পানির নমুনায় ফ্লোরাইডের মাত্রা সাধারণত নিরাপদ সীমার ভেতরেই থাকে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নলকূপের পানিতে গড় ফ্লোরাইড ০.৫৬ মিলিগ্রাম/লিটার, ভূপৃষ্ঠের পানিতে ০.১৪ মিলিগ্রাম/লিটার এবং শহরের সরবরাহকৃত পানিতে গড় ০.৩৩ মিলিগ্রাম/লিটার। এই ফলাফলগুলো নির্দেশ করে যে, বাংলাদেশের পানীয় জলে ফ্লোরাইডের মাত্রা সর্বোচ্চ অনুমোদিত সীমা (১ মিলিগ্রাম/লিটার)-এর চেয়ে নিচেই রয়েছে। তাই আপনার কমিউনিটির পানিতে যদি ফ্লোরাইড প্রস্তাবিত মাত্রায় থাকে, তবে সম্ভবত অতিরিক্ত ফ্লোরাইড গ্রহণের প্রয়োজন নেই।

ফ্লোরাইডের নিরাপদ ব্যবহারের উপায়

সাধারণভাবে ফ্লোরাইড সম্পূর্ণ নিরাপদ। স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো তখনই দেখা দেয় যখন এটি অত্যধিক মাত্রায় গ্রহণ করা হয়। এই ঝুঁকিগুলো এড়াতে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করুন:

  • গিলে ফেলা থেকে বিরত থাকুন: টুথপেস্ট বা দাঁতের যত্নে ব্যবহৃত অন্যান্য পণ্য কোনোভাবেই গিলে ফেলা উচিত নয়।
  • বাচ্চাদের নাগালের বাইরে রাখুন: ছোট বাচ্চাদের নাগালের বাইরে টুথপেস্ট সংরক্ষণ করুন। অন্তত ৭ থেকে ৮ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত সন্তানের দাঁত ব্রাশ করার সময় সাথে থাকুন এবং সাহায্য করুন।
  • পানির ফ্লোরাইড সম্পর্কে জানুন: আপনার বসবাসরত এলাকার খাবার পানিতে ফ্লোরাইডের মাত্রা জানার চেষ্টা করুন।
  • ফ্লোরাইড-মুক্ত পেস্ট: যদি আপনি নিশ্চিত হন যে আপনার শিশু খাবার পানি বা অন্য কোনো উৎস থেকে পর্যাপ্ত ফ্লোরাইড পাচ্ছে, তবে আপনি চাইলে ফ্লোরাইড-মুক্ত শিশুদের টুথপেস্টও ব্যবহার করতে পারেন।

আপনি যদি আপনার সন্তানের দাঁতে কোনো অস্বাভাবিক দাগ বা পরিবর্তন লক্ষ্য করেন, তবে অবহেলা না করে দ্রুত একজন বিডিএস (BDS) ডিগ্রিধারী ডেন্টিস্টের পরামর্শ নিন।


MS

লিখেছেন Prof. Dr. Musa Siddik

এফসিপিএস (ওএমএস) · অধ্যক্ষ, রংপুর কমিউনিটি ডেন্টাল কলেজ

এই আর্টিকেলটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে: